দূরত্ব, প্রকৃত ভাড়ার তালিকা, পরিবহন অনুযায়ী কাউন্টার নম্বর এবং হবিগঞ্জের ঐতিহাসিক স্থানের বিবরণ — সবকিছু এক জায়গায়।
ঢাকা টু হবিগঞ্জ বাস ভাড়া নির্ভর করে আপনি কোন পরিবহন সংস্থায় যাত্রা করছেন তার ওপর। সায়েদাবাদ, মহাখালী এবং উত্তরার আব্দুল্লাহপুর — এই তিন জায়গা থেকেই হবিগঞ্জগামী বাস ছাড়ে, তবে অগ্রদূত, দিগন্ত ও বিছমিল্লাহর মতো সরাসরি হবিগঞ্জ রুটের পরিবহনগুলো মূলত সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল কেন্দ্রিক। এই গাইডে দূরত্ব, সময়, প্রকৃত ভাড়া, প্রতিটি পরিবহনের কাউন্টার নম্বর এবং হবিগঞ্জের ঐতিহাসিক পরিচিতি — সবকিছু নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে যাচাই করে বিস্তারিতভাবে দেখানো হয়েছে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সরকারি দূরত্ব তালিকা অনুযায়ী ঢাকা থেকে হবিগঞ্জের সড়কপথ দূরত্ব প্রায় ১৭৯ কিলোমিটার। যাত্রাপথ ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ধরে ভৈরব সেতু পার হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মাধবপুর ও শায়েস্তাগঞ্জ হয়ে হবিগঞ্জ সদরে পৌঁছায়। স্বাভাবিক ট্রাফিকে বাসে এই পথ পাড়ি দিতে সাধারণত ৩.৫ থেকে ৪.৫ ঘণ্টা সময় লাগে — বাসের সময়সূচী পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বেশিরভাগ ট্রিপ ৪ ঘণ্টার আশেপাশেই গন্তব্যে পৌঁছায়।
| রুট অংশ | আনুমানিক দূরত্ব |
|---|---|
| সায়েদাবাদ/মহাখালী → ভৈরব | ~৯০ কিমি |
| ভৈরব সেতু → ব্রাহ্মণবাড়িয়া | ~৩৫ কিমি |
| ব্রাহ্মণবাড়িয়া → মাধবপুর → শায়েস্তাগঞ্জ → হবিগঞ্জ সদর | ~৫৪ কিমি |
| মোট (আনুমানিক) | ~১৭৯ কিমি |
এই মুহূর্তে ঢাকা-হবিগঞ্জ রুটে কোনো নির্ধারিত এসি বাস সার্ভিস নেই — সব কটি পরিবহনই নন-এসি বাসে সরাসরি সার্ভিস দেয়। ভাড়া পরিবহনভেদে কিছুটা ভিন্ন হয়।
| পরিবহন কোম্পানি | সিটের ধরন | ভাড়া |
|---|---|---|
| এনা ট্রান্সপোর্ট | নন-এসি | ৳৩৫০–৪৬০ |
| হানিফ এন্টারপ্রাইজ | নন-এসি (ইকোনমি) | ৳৪৬০ |
| অগ্রদূত পরিবহন সরাসরি সার্ভিস | নন-এসি | ৳৩৫০–৪০০ |
| দিগন্ত পরিবহন | নন-এসি | ৳৩৫০–৪০০ |
| বিছমিল্লাহ পরিবহন | নন-এসি | ৳৩৫০–৪০০ |
💡 ভাড়া বোর্ডিং পয়েন্ট ও তারিখের ওপর নির্ভর করে সামান্য ভিন্ন হতে পারে। যাত্রার আগে কাউন্টারে ফোন করে নিশ্চিত হওয়াই ভালো। দলবদ্ধভাবে যেতে চাইলে রিজার্ভ মাইক্রোবাসের ভাড়াও চেক করে দেখতে পারেন।
নিচের কাউন্টার নম্বরগুলো হবিগঞ্জ সদর উপজেলা প্রশাসনের অফিসিয়াল তথ্য থেকে নেওয়া। যাত্রার আগে সরাসরি ফোন করে সময় ও আসন নিশ্চিত করে নিন।
এনা ট্রান্সপোর্ট ও হানিফ এন্টারপ্রাইজের কাউন্টার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে অবস্থিত — টার্মিনালে সরাসরি গিয়ে বা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির নিজস্ব হটলাইনে যোগাযোগ করে টিকিট নিশ্চিত করা যায়।
সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে ভোর ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত বিভিন্ন পরিবহনের বাস হবিগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। প্রধান কয়েকটি পরিবহনের সময়সূচী নিচে দেওয়া হলো।
| পরিবহন | ছাড়ার সময় |
|---|---|
| অগ্রদূত পরিবহন | সকাল ৭:১০, ৯:৫০, ১১:১০ · দুপুর ১:১০ · সন্ধ্যা ৬:৩০ |
| দিগন্ত পরিবহন | সকাল ৯:১০, ১১:৫০ · দুপুর ১:৫০ · সন্ধ্যা ৭:৪৫ |
| বিছমিল্লাহ পরিবহন | সকাল ৬:৩০, ৭:৫০, ১০:৩০ · দুপুর ১২:৩০, ২:৩০ · বিকাল ৫:১০ · সন্ধ্যা ৭:১০ |
| এনা ট্রান্সপোর্ট | ভোর ৫:০৫ থেকে রাত পর্যন্ত প্রতি ঘণ্টায় একাধিক ট্রিপ |
প্রতিটি ট্রিপে সিট সংখ্যা সীমিত, তাই ব্যস্ত সময়ে (সকাল ও সন্ধ্যা) আগে থেকে ফোনে সিট বুক করে রাখা নিরাপদ।
সরাসরি হবিগঞ্জগামী বাস না পেলে যেকোনো ঢাকা-সিলেট রুটের বাসে উঠে শায়েস্তাগঞ্জ মোড়ে নেমে যেতে পারেন। এই মোড় থেকে হবিগঞ্জ সদরের দূরত্ব খুবই কম, স্থানীয় সিএনজি, মাক্সি বা লোকাল বাসে সহজেই পৌঁছানো যায়। ঢাকা-সিলেট রুটে গোল্ডেন লাইন, শ্যামলী, হানিফসহ একাধিক পরিবহনের ঘন ঘন ট্রিপ থাকায় এই বিকল্প পথে অপেক্ষার সময়ও কম হয়।
সায়েদাবাদ, মহাখালী বা আব্দুল্লাহপুরের কাউন্টারে গিয়ে সরাসরি টিকিট কেটে নিতে পারেন।
উপরের কাউন্টার নম্বরে কল করে অগ্রিম সিট বুক করা যায় — বিশেষ করে ছুটির দিনে এটি বেশি নিরাপদ।
যাত্রার দিন সকালে একবার কাউন্টারে ফোন করে বাস ছাড়ার সময় ও প্ল্যাটফর্ম নিশ্চিত করে নিন।
সুরমা অববাহিকার খোয়াই, করাঙ্গী, সুতাং ও রত্না নদী বিধৌত হবিগঞ্জ একটি ঐতিহাসিক জনপদ। সুফি সাধক হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর অনুসারী সৈয়দ নাছির উদ্দিনের স্মৃতিধন্য এই এলাকার নামকরণের পেছনেও রয়েছে আকর্ষণীয় ইতিহাস।
ঐতিহাসিক সুলতানসী হাবেলীর প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ সুলতানের বংশধর সৈয়দ হেদায়েত উল্লাহর পুত্র সৈয়দ হবিব উল্লাহ খোয়াই নদীর তীরে একটি গঞ্জ বা বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর নামানুসারে এলাকাটির নাম হয় হবিবগঞ্জ, যা কালক্রমে হবিগঞ্জে রূপান্তরিত হয়। ইংরেজ শাসনামলে ১৮৬৭ সালে হবিগঞ্জকে মহকুমা ঘোষণা করা হয় এবং ১৮৭৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে হবিগঞ্জ মহকুমা গঠন করা হয়।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার রাজিউড়া ইউনিয়নে অবস্থিত এই মসজিদ প্রায় সাড়ে ছয়শ বছরের পুরনো। এটি নির্মিত হয়েছিল বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের শাসনামলে, সুলতানি আমলের স্থাপত্যশৈলীর একটি অনন্য নিদর্শন হিসেবে আজও টিকে আছে।
বানিয়াচং উপজেলার বিতঙ্গল গ্রামে অবস্থিত এই বৈষ্ণব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ষোড়শ শতাব্দীতে বৈষ্ণব ধর্মগুরু রামকৃষ্ণ গোস্বামী প্রতিষ্ঠা করেন। এটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত।
বানিয়াচং গ্রামে অবস্থিত প্রায় ৬৫ একর আয়তনের এই দিঘি বানিয়াচং রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা রাজা কেশব মিশ্র খনন করিয়েছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে; দিঘির পশ্চিম পাড়ে আজও তাঁর প্রাচীন রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই দিঘির পাড়ে বসেই পল্লিকবি জসীমউদ্দীন রচনা করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা “কমলা রানীর দিঘি”।
হবিগঞ্জ গ্যাসফিল্ড আবিষ্কৃত হয় ১৯৬৩ সালে, আর দেশের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানা গ্যাসফিল্ড আবিষ্কৃত হয় ১৯৯৮ সালে — এই দুটি ক্ষেত্র বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে হবিগঞ্জকে একটি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জেলায় পরিণত করেছে।
মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া চা বাগান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সাথে ঐতিহাসিকভাবে জড়িত — এখানেই মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে সেক্টর কমান্ডারদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যার স্মরণে বাগান সংলগ্ন এলাকায় একটি স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে।
এছাড়া চুনারুঘাট উপজেলার চা বাগান ও রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হবিগঞ্জের প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। বাসে হবিগঞ্জ পৌঁছানোর পর স্থানীয়ভাবে এই সব ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক স্থান ঘুরে দেখতে চাইলে রিজার্ভ মাইক্রোবাস বা প্রাইভেট কার ভাড়া নেওয়া সবচেয়ে সুবিধাজনক, কারণ এই স্থানগুলো শহর থেকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় পাবলিক পরিবহনে ঘোরা সময়সাপেক্ষ।
শংকরপাশা মসজিদ, বানিয়াচং বা তেলিয়াপাড়ার মতো ছড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক স্থান ঘুরতে পুলিশ ভেরিফাইড চালকসহ রিজার্ভ মাইক্রোবাস বা বাস ভাড়া করুন — তারিখ ও যাত্রী সংখ্যা জানিয়ে দিন, বাকিটা আমরা দেখব।